ছবি সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বিশ্বব্যাপী এই যে ধ্বংসলীলা চলছে- এ নিশ্চয়ই থামবে, কিন্তু কোথায় গিয়ে থামবে এবং কীভাবে, সে প্রশ্ন এখন সর্বত্র। স্বভাবতই। এর মধ্যেই খেলাও চলছে নানা রকমের। যেমন নির্বাচনের খেলা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনকে একটা খেলা বলেছিলেন। অনুসারীরা তাঁর সে কথার প্রতিধ্বনি তুলেছেন, গানও বাঁধেন। কিন্তু ওই যে নিয়ম আছে, কারও জন্য যা খেলা অনেকের জন্য তা মরণ, সেটা যাবে কোথায়? সেটা ঠিকই ঘটেছে। করোনাকালে, পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন দিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিল, তার জন্য কমিশনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করা যায় বলেও রায় দিয়েছিলেন চেন্নাইয়ের হাই কোর্ট। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন বটে, কিন্তু তার চেয়েও স্বাধীন হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দুর্দান্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এঁদের নেতৃত্বে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার রাজ্য-দখলে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে। তবে বিদেশি কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, নিজের দেশের মানুষদের বিরুদ্ধেই। ঠিক যেভাবে কোনো দেশের সামরিক বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করে থাকে, যখন তারা সামরিক শাসন জারি করে। সামরিক বাহিনীর ওই যুদ্ধ, কখনো কখনো তা-ও রক্তপাতহীন হয়। বিজেপির যুদ্ধ কিন্তু তেমন নয়। এই যুদ্ধ মানুষের মাথা খায়- বাইরের এবং ভিতরের। এদের অনুসারীরা মানুষ হত্যা করে এবং মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে সেখানে স্থায়ী বিকার ঘটায়। মোদির লক্ষ্য ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানো। তবে হিন্দুত্বের আধ্যাত্মিক স্বার্থে নয়, নিজেদের বস্তুগত স্বার্থে। সেজন্যই রাজ্য-দখলে তাঁদের যুদ্ধ তৎপরতা।
মোদিদের বিশেষ লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ওই রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতা তেমন একটা পাত্তা পায়নি। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা আছে। বামপন্থিরা সেখানে একটানা চৌত্রিশ বছর রাজ্য পরিচালনা করেছেন। এবং সে সময়ে আর যা-ই ঘটুক হিন্দু জাতীয়তাবাদ তৎপর হতে পারেনি। ব্যতিক্রমী এই রাজ্যটা তাই জয় করা চাই। জয় করতে পারলে হিন্দু জাতীয়তাবাদের রথের পক্ষে সর্বত্রগামী হবার পথটা আরও পরিষ্কার হবে। হাসি-হাসিমুখে সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাকে খেলা বলেছিলেন, সেটা তাঁর জন্য আসলে একটা যুদ্ধই ছিল। তাই বলে তিনি যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শত্রুপক্ষ ছিলেন, এমনও কিন্তু নয়। আমরা কী করে ভুলি যে তাঁর হাত ধরেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের সুড়ঙ্গ খুঁড়তে পেরেছিল। দুশমন বামদের হটানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে যে নির্বাচনি আঁতাত গড়েছিল, তাতে বামজোট তখনকার মতো হার মানেনি সত্য, কিন্তু মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ওই প্রথম প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তারপর বহুবিধ প্রলোভন দেখিয়ে এবং হিন্দুত্ববাদের মাহাত্ম্য অনবরত প্রচার করে, বিজেপি অগ্রসর হতে থাকে। শুরু করে রাজ্য বিধানসভায় মাত্র একটি আসন জিতে; পরেরবার পেয়েছে তিনটি। তারপর পেল গুনে গুণে সাতাত্তরটি। এবারে দুই-তৃতাংশ। এই বিজয় অভিযানে গেরুয়াধারীদের পোশাকে মানুষের রক্তের বিস্তর ছাপ পড়েছে। টার্গেট করেছিল ২০০ আসন পাবে, সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমন কোনো কাজ নেই যা তারা বাকি রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর দপ্তরের কাজের দায়িত্ব শিকেয় তুলে রেখে, পশ্চিমবঙ্গ দখলে নানা ছক কষেছেন, তাঁর অতি দুর্ধর্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন্দ্রীয় দায়িত্ব ফেলে পশ্চিমবঙ্গে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। অন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও নেতারাও কিছু কম করেননি। আর যেটা অভিনব ঘটনা, কখনো ঘটেনি, সেটা হলো ভোট ধরবার মানসে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী ভিন্ন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ-প্রত্যাগত’ অভিযোগ তুলে ৯১ লাখ ভোটারের ভোট বাতিল করেছে এসআইআর বাস্তবায়ন করে। মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার পর্যন্ত হরণ করেছে। মুসলিম ভোটারদের তো করেছেই। এসআইআর-এ বাতিল করা ৯১ লাখ ভোটারের ট্রাইব্যুনালে আপিলের বিধান থাকলেও, নির্বাচনের আগপর্যন্ত বাতিল করা ভোটারদের ভোট প্রদানের সুযোগ হয়নি।
টাকা ঢালা হয়েছে অঢেল। নগদ প্রাপ্তির লোভ দেখিয়ে তৃণমূলের কর্মীদের তো বটেই, ওই দলের বড় বড় চাঁইদেরও পক্ষপুটে টেনে নিয়েছে বিজেপি। অন্য রাজ্য থেকে লোক এনেছে, পরামর্শক এনেছে ভাড়া করে। গণমাধ্যম তো অনেকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং অধিকাংশই পুঁজিওয়ালাদের মালিকানাধীন, যারা স্বভাবগত কারণেই বিজেপি সরকারের অনুগত। গণমাধ্যমে বিজেপির পক্ষে এবং তৃণমূলের বিপক্ষে তুমুল প্রচারণা চালিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দিক থেকে সমুদয় কলকবজা, যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না। বিজেপির নিরঙ্কুশ পশ্চিমবঙ্গ দখল তাই অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও নাটকীয় শঠতার নির্বাচনি কৌশল প্রয়োগে। আর অত্যাশ্চর্য ঘটনা হলো- পশ্চিমবঙ্গে অতদিন ধরে যারা শাসন করেছিল, সেই তৃণমূল কংগ্রেস এবারের নির্বাচনে ৮০টি আসন পেয়েছে। এর প্রধান কারণ তাদের জনবিচ্ছিন্নতা। তারা শাসন করেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে না তুলে বৈরী সম্পর্কের পাশাপাশি ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে দুর্নীতির চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। নিজেদের প্রতিষ্ঠা দেখে ভেবেছে যে ভোটের মধ্য দিয়েই তারা আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারবে; বিশ্বে কোথাও যা ঘটেনি তারই দৃষ্টান্ত তারা পশ্চিমবঙ্গে স্থাপন করবে। বাংলা আজ যা ভাবে, ভারতবর্ষ তা ভাবে পরের দিন; এ কথা তো চালু আছেই! ওদিকে বামফ্রন্টে সিপিআইএম-ই ছিল প্রধান, স্বঘোষিত রূপেই তারা কমিউনিস্ট, কিন্তু কমিউনিস্টদের যেটা প্রধান গুণ- সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস- সেটাকে বিকশিত না করে নিজেদের তাঁরা সংসদীয় দল হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। বিপ্লবের স্বপ্নের পরিবর্তে সুযোগসুবিধা বিতরণ করে তাঁরা মহোৎসাহে সংসদীয় সীমায় আটকে থাকলেন। জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকলেন। একসময় যখন তাঁরা টের পেলেন যে পায়ের তলায় মাটি নেই, জনগণ বিপক্ষে চলে গেছে এবং তৃণমূলের মমতাদিদি বাম-হটাও আওয়াজ দিচ্ছেন এবং আরএসএস বিজেপিকে সঙ্গী করে এককাট্টা হয়ে। সিপিএম তখন তৃণমূলকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করাটাই নির্বাচনে জেতার প্রধান উপায় ঠাওরাল। কিন্তু সুবিধা করতে পারল না। গড়িয়ে পড়ে গেল।
মমতা অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ দখলের ব্যাপারে বিজেপিকে প্রথম চোটে তেমন একটা সুবিধা করে দিতে পারেননি। তবু হাতে ধরে যে রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন, তার প্রসাদ হিসেবে কেন্দ্রীয় মোদি সরকারের অধীনে মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। রেলমন্ত্রী হয়ে তিনি কোনো ত্রুটি করেননি। দলের কর্মীদের মধ্যে চাকরি, ঠিকাদারি, দানখয়রাত ইত্যাদি যত রকমের সুবিধা সম্ভব উদার হস্তে বিতরণ করেছেন। তাতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ল, সিপিএমের ক্যাডাররা পর্যন্ত ভবিষ্যৎ রয়েছে তৃণমূলেই, এটা টের পেয়ে সেদিকেই রওনা দিল। সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় শিল্পী-সাহিত্যিকরাও অনেকে দেখা গেল ‘খাঁটি বাঙালি মেয়ে’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই ঝুঁকেছেন। বামফ্রন্টের শাসনের অবসান ঘটল এবং মমতা মুখ্যমন্ত্রী হলেন। বামরা মাঠে নেই, এই অবস্থায় তৃণমূলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিজেপি সুবিধা পেয়ে গেল। তারা সবেগে এগোতে থাকল। বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হিন্দুত্ববাদের ডাকে সাড়াও পাওয়া গেল।
শূন্য থেকে বিজেপি জিতেছে, এমন জয় তৃণমূল এবং বামফ্রন্টও কখনো পায়নি। কিন্তু এর কারণ কি বিজেপির জনপ্রিয়তা? মোটেই নয়। দলের দাঙ্গাবাজ উগ্রবাদী মস্তানদের পক্ষে জনপ্রিয় হওয়ার কোনো কারণই নেই। দুর্নীতি, অত্যাচার, দুঃশাসন, সব দিক দিয়েই তৃণমূল সরকার আগের সরকারগুলোকে হারিয়ে দিয়েছে- এ তারই ফল। আগে জিতেছিলেন তিনি স্রেফ বিজেপির নিরঙ্কুশ সমর্থন ও সহায়তার কারণে। যে বিজেপিকে তিনি ডেকে এনেছিলেন, যারা তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করেছিল, তারাই এবার তাঁকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রভাবে কৌশলে হটিয়ে জয়ী হলো। বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের আওয়াজে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা রীতিমতো ভড়কে গেছিল। রাক্ষসকে ঠেকানোর জন্য তারা মমতাকে জয়ী করে এসেছিল। রাক্ষসের ভয়ে দৈত্যের শরণাপন্ন হওয়া! রাক্ষস তো একদম গিলে খাবে, দৈত্য অত দূর যাবে না। ওই একই শঙ্কায় বামপন্থিদের ভোটও গিয়ে পড়েছে তাদের শত্রু পক্ষে। এবার অবশ্য বামরা একটি আসন পেয়েছে, শূন্য হয়নি। বিজেপির বিজয় অপ্রত্যাশিত বৈকি, তৃণমূল নিজেও এতটা আশা করেনি।
তা ছাড়া এই পরাজয়ে তৃণমূল দলটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সন্দেহ নেই যে বিজেপি আরও এগোবে। বিজেপি-সমর্থক দুজন আইনজীবী সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটিকে মুছে ফেলার আবদার জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল রুজু করেছিলেন। এবার যুক্ত হয়েছে হিন্দুস্তান কেবলই হিন্দুদের, অহিন্দুদের নয়, তারা বহিরাগত, তাদের দেশছাড়া করতে হবে; বিশেষ করে অহিন্দু জনগোষ্ঠীকে।
মমতার পথ ধরে বিজেপির ফ্যাসিবাদী তৎপরতা যতই বৃদ্ধি পাবে, ততই আশা করা যাবে যে তার পতন ঘনিয়ে আসছে। হিটলারের বেলাতে যেমনটা ঘটেছিল। তার মানে অবশ্য এটা নয় যে পুঁজিবাদের নানান কিসিমের ফ্যাসিবাদী তৎপরতা দুনিয়া থেকে অচিরেই বিদায় নেবে। না, নেবে না। তাকে বিদায় করার জন্য দরকার হবে সামাজিক বিপ্লবের। কোনো এক দেশে নয়, অধিকাংশ দেশে এবং শেষ পর্যন্ত সব দেশেই। হায়, গণতন্ত্র তো দেখছি বিদায় নিচ্ছে- বলে যে আর্তধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তার অন্তর্নিহিত মর্মবাণীটি হচ্ছে এই যে, শুধু গণতন্ত্র নয়, মানুষের অস্তিত্বই আজ যেন হুমকির মুখে এবং তার জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়, দায়ী হচ্ছে পুঁজিবাদের চরমকালে পরম অত্যাচার।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








